বিচ্ছিন্ন খুলনা পরিণত মিছিলের শহরে, বাধাবিঘ্ন উপেক্ষা করে বিপুল জনসমাগম।

খুলনাকে সড়ক ও জলপথে বিচ্ছিন্ন করে রাখা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত শহরে অনুষ্ঠিত বিএনপির বিভাগীয় সমাবেশে বহু মানুষের সমাগম হয়েছে।
দুপুর থেকে শুরু হওয়া এই সমাবেশে বিএনপি চারটি দাবি তুলে ধরেছে। সমাবেশকে ঘিরে ছোট দুটি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটলেও মোটা দাগে শান্তিপূর্ণই হয়েছে। পুলিশের তরফ থেকেও খুব একটা বাধা দেয়ার ঘটনা ঘটেনি। বিভিন্ন পয়েন্টে উপস্থিত পুলিশের সদস্যদেরকে শুধুমাত্র সমাবেশে আগতদের কাছে লাঠি থাকলে তা নিয়ে নিতে দেখা গেছে।
পঞ্চাশ কিলোমিটার হেঁটে জনসভায়
হঠাৎ করে ডাকা পরিবহন ধর্মঘটে গতকাল শুক্রবার থেকে সব ধরণের বাস ও লঞ্চ চলাচল বন্ধ থাকার পর মাঝিদের ধর্মঘটের মাধ্যমে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে রূপসা ঘাট ও জেলখানা ঘাটে যাত্রী পারাপার। এ দুটি ঘাট শহরের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত।
কিন্তু এই ধর্মঘট সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষের সমাগম হয়েছে জনসভায়। খুলনা শহর থেকে বিবিসির সংবাদদাতা আকবর হোসেন জানাচ্ছেন যে, শুক্রবার রাত থেকেই বিএনপির হাজার হাজার নেতাকর্মী খুলনা শহরে ঢুকে পড়েছিল।
বিভাগের আসপাশের দশটি জেলা থেকে দুতিনদিন আগে থেকেই শহরের দৌলতপুর ও খালিশপুরসহ অন্যান্য এলাকায় এসে জড়ো হয়েছিলেন বলে জানাচ্ছেন সংবাদদাতা।

সবগুলো জেলা থেকেই মানুষ এসে যোগ দেয় এই জনসভায়। রাত বারোটার দিকে তারা শহরের সোনালী ব্যাংক চত্বরে এসে জড়ো হতে শুরু করেন, যেখানে তৈরি করা হয়েছে সভামঞ্চ। সকাল থেকেই খুলনা শহর পরিণত হয় মিছিলের নগরীতে। রাস্তাঘাটগুলো ছিল বিএনপি নেতাকর্মীতে পূর্ণ।
বিএনপি নেতারা বলছেন রিকশা, ইজিবাইক কিংবা পায়ে হেঁটে যে যেভাবে পারছেন খুলনা অভিমুখে আসছেন।
খুলনা শহর থেকে প্রায় একশ বিশ কিলোমিটার দূরের ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ থেকে সাইফুল ইসলাম ফিরোজের নেতৃত্বে একটি মিছিল সকাল দশটার দিকে শহরে এসে পৌঁছে। মিস্টার ইসলাম গত সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন।
বিবিসি বাংলাকে তিনি জানিয়েছেন যে, তার নেতাকর্মীরা প্রায় ৫০ কিলোমিটার পায়ে হেঁটে শহরে এসেছে। “সব বন্ধ করে দিয়েছে কাল থেকে। তাও যে যেভাবে পেরেছে এসেছে। শেষ পর্যন্ত প্রায় ৫০ কিলোমিটার হাঁটতে হয়েছে। শহর লোকে লোকারণ্য হয়ে গেছে সকালেই,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।
মিছিলকারীরা তাদের দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রতিকৃতি বহন করছিলেন।
অনেকের হাতে দলের নির্বাচনী প্রতীক ধানের শীষ দেখা গেছে। কেউ কেউ নেচে গেয়ে সমাবেশে এসেছেন। মিছিলে সরকারবিরোধী বিভিন্ন শ্লোগান দেয়া হয়েছে। সমাবেশের মঞ্চ থেকে রাজনৈতিক গান প্রচার করে কর্মী সমর্থকদের উজ্জীবিত করা হচ্ছিল সকাল থেকেই।

দুটো বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ
এই সমাবেশকে ঘিরে বড় কোন সহিংসতার ঘটনা ঘটেনি। তবে ছোট দুটি বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ হয়েছে। এর একটি ঘটে রেলস্টেশন সংলগ্ন এলাকায়। এখানে বিএনপি নেতা-কর্মীরা পুলিশের সাথে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। যদিও উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপে সংঘর্ষ বেশিদূর গড়ায়নি। কর্মকর্তারা পুলিশের সদস্যদেরই সংঘর্ষে জড়ানো থেকে নিবৃত্ত করেন। দ্বিতীয় সংঘর্ষটি বাঁধে শহরের শিববাড়ি মোড় এলাকায়। এসময় একদল মোটরসাইকেল আরোহীকে বিএনপি সমর্থকদের ধাওয়া দিতে দেখা যায়।

এসময় দুপক্ষ পরস্পরের ওপর ইটপাটকেল ছুঁড়তে শুরু করে। তবে এই সংঘর্ষও বেশিদূর গড়ায়নি। এক পর্যায়ে মোটরসাইকেল আরোহীরা সেখান থেকে চলে যায়। শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে পুলিশের চেকপোস্ট ছিল। তবে তারা সমাবেশে আগতদের কোন বাধা দেয়নি। শুধুমাত্র যাদের হাতে লাঠি ছিল সেই লাঠিগুলো পুলিশ নিয়ে নিচ্ছিল। খুলনা পুলিশের উর্দ্ধতন একজন কর্মকর্তা বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, তাদের প্রতি নির্দেশনা রয়েছে যাতে লাঠি নিয়ে কেউ সমাবেশে যেতে না পারে। এতে সংঘাতের আশঙ্কা থাকে। তারপরও অনেকে লাঠি নিয়ে ঢুকে গেছে, বিবিসির আকবর হোসেনকে বলেন ওই কর্মকর্তা।

খালি চেয়ার
সমাবেশে প্রধান অতিথি ছিলেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সকালেই কেন্দ্রীয় নেতাদের নিয়ে তিনি খুলনা পৌঁছে যান। সভামঞ্চে একটি চেয়ার ফাঁকা রেখে বাকী চেয়ারগুলোতে নেতারা বসেন। বিএনপি নেতারা জানান, তারা তাদের চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার জন্য চেয়ারটি ফাঁকা রেখেছেন। বিএনপির কেন্দ্রীয় একজন নেতা শহিদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি বলেন, “এই চেয়ার ফাঁকা রাখাটা প্রতীকী ব্যাপার”।
মি. চৌধুরী বলেন, তারা মনে করেন সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বিএনপি ক্ষমতায় আসবে এবং খালেদা জিয়া ফের রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন। সেটাকে প্রতীকী রূপ দেয়ার জন্যই তারা চেয়ার ফাঁকা রেখেছেন। সমাবেশে নেতারা চারটি দাবি তুলে ধরেন:
এক. খালেদা জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তি
দুই. নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন
তিন. জ্বালানি তেল ও জিনিসপত্রের দামের উর্দ্ধগতির নিয়ন্ত্রণ

চার. নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা ও পুলিশি হয়রানি বন্ধ করা
খুলনার এই সমাবেশটি সম্প্রতি শুরু হওয়া বিএনপির ধারাবাহিক বিভাগীয় পর্যায়ের সমাবেশের তৃতীয়টি। প্রথম সমাবেশটি হয় চট্টগ্রাম। সেই সমাবেশে বিএনপির বড় জনসমাগম হয়।
দ্বিতীয় সমাবেশটি ময়ময়নসিংহে হয়। এই সমাবেশের আগেও কয়েকদিন ধরে ময়মনসিংহ শহরকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের সংগঠনগুলো। এসময় বিএনপির তরফ থেকে অভিযোগ করা হয়েছিল সরকার বিএনপির এই সমাবেশকে বাধাগ্রস্ত করতে তাদের সমর্থিত পরিবহন মালিক সমিতি দিয়ে কৃত্রিমভাবে শহরকে বিচ্ছিন্ন করেছিল। সরকারি দল অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করে। অবশ্য বাধা বিপত্তি সত্ত্বেও ময়মনসিংহে বড় জমায়েত করতে সমর্থ হয় বিএনপি। এবার খুলনাতেও একইভাবে যানবাহন সংকট তৈরি করে শহরকে বিচ্ছিন্ন করে রাখার মত পরিস্থিতি দেখা গেল। তারপরও শেষ পর্যন্ত খুলনাতেও বড়সড় জমায়েতই হল।
# ২২/১০/২০২২, খুলনা #