বিজ্ঞান ভাবনা (১৮৭): গণ মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয় ৬৫-বিজন সাহা
৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ গণ মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয় ৬৫ বছরে পূর্তি উপলক্ষ্যে প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীদের এক মিলন মেলা আয়োজন করল। অনুষ্ঠান চলল ৯ তারিখ পর্যন্ত। ৮ ফেব্রুয়ারি বরাবরের মতই ক্রেমলিনের কনসার্ট হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক গ্রুপ তাদের নাচ গানে ভরিয়ে রাখল অতিথিদের মন। ১৯৮৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয় যখন ২৫ বছর পূর্তি উৎসব পালন করে আমি নিজেও ছিলাম এর অংশ। কোরাস বাংলাদেশের সদস্য হিসেবে আমরা অধুনালুপ্ত হোটেল রাশিয়ার কনসার্ট হলে গান গেয়েছিলাম। সেই সময় আমরা অবশ্য বিভিন্ন অনুষ্ঠানেই বাংলা গণ সঙ্গীত গাইতাম। প্রতি পাঁচ বছর পর পর জন্মদিনের এই অনুষ্ঠান শুধু ইউনিভার্সিটির এক একটা মাইল স্টোনই নয়, আমরা যারা এখানে পড়াশুনা করেছি তাদের জন্য বিরাট সুযোগ ছাত্রজীবনের বন্ধুদের সাথে দেখা করার। সেই সময়ে আমাদের ইউনিভার্সিটিতে ১১০ দেশের ছেলেমেয়েরা পড়াশুনা করত। সোভিয়েত ইউনিয়নের বাইরে ছিল এশিয়া, আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকা ও মধ্য প্রাচ্যের তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর ছেলেমেয়েরা। এখন সেই বাধা উঠে গেছে। বর্তমানে ইউরোপ, আমেরিকা, চীন, জাপান, কোরিয়া সহ প্রায় ১৬০ দেশের ছেলেমেয়েরা এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করে। বেড়েছে ছাত্রছাত্রীদের সংখ্যা, তৈরি হয়েছে নতুন শিক্ষাঙ্গন, হোস্টেল। বেড়েছে বৈষম্যও। কেন? আমাদের সময় সবাই মূলত সোভিয়েত সরকারের বৃত্তিতে চলতাম। তাই কম বেশি সবাই ছিলাম একই নৌকার যাত্রী। এখন যেহেতু শুধু সরকারি বৃত্তি নয়, ব্যক্তিগত খরচেও অনেকে পড়তে আসে আর বিভিন্ন গ্রুপের মানুষের সামর্থ্য বিভিন্ন রকম তাই থাকা খাওয়ার ব্যবস্থাও ভিন্ন। যারা রাশিয়ার সরকারের বৃত্তি নিয়ে আসে ও মূলত তার উপর নির্ভরশীল তারা থাকে আমাদের সময়ের পুরানো হোস্টেলে। যাদের সামর্থ্য আছে তারা নতুন হোস্টেলে থাকে যাকে হোস্টেল না বলে হোটেল বলাই শ্রেয়। এক কথায় আগের সেই সমাজতান্ত্রিক ছাত্রজীবন এখন পুঁজিবাদে আক্রান্ত, অন্তত থাকা খাওয়ার ব্যাপারে। শুধু থাকা খাওয়ার কথাই বলি কেন, এখন চাইলে কেউ রুশ ভাষা না শিখেও পড়াশুনা করতে পারে। তাদের জন্য ইংরেজিতে ক্লাস নেয়া হয়। তবে এরা সাধারণত নিজের খরচে আসে। আমি নিজে যাদের পড়াই তাদের মধ্যে অনেক আফ্রিকান ছেলেমেয়ে আছে। ওরা সরকারি বৃত্তিতে পড়াশুনা করে তাই রুশ শিখতে হয়। যদিও আমি ওদের পরীক্ষা নেই ইংরেজিতে, অনেক সময় প্রশ্নের উত্তর দেই ইংরেজিতে, তবে এটা বাধ্যতামূলক নয়। কিন্তু ওরা পে করে ইংরেজি মাধ্যমে পড়তে চাইলে আমাকে ওদের ইংরেজিতেই পড়াতে হত। এক কথায় ফেল কড়ি মাখ তেল। যাই হোক, প্যাট্রিস লুমুম্বা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে এখনও প্রচুর মানুষের আগ্রহ আছে বিধায় আজ এ নিয়ে কিছু কথা বলব।
১৯৬০ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মন্ত্রী সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গণ মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৬১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর প্রধানমন্ত্রী প্যাট্রিস এমেরি লুমুম্বার নামানুসারে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরণ করা হয় প্যাট্রিস লুমুম্বা গণ মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়। উল্লেখ করা যেতে পারে যে প্যাট্রিস লুমুম্বা ছিলেন উপনিবেশবাদ বিরোধী নেতা যিনি ১৯৬১ সালের ১৭ জানুয়ারি নিহত হন। এই নাম বহাল ছিল ১৯৯২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত যখন সোভিয়েত পরবর্তী রাশিয়ার নেতৃত্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরণ করে রাশিয়ান গণ মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়। এটা সোভিয়েত পরবর্তী রাশিয়ার পররাষ্ট্রনীতির পরিবর্তনের কথাই বলে। তবে মানুষের কাছে এই বিশ্ববিদ্যালয় প্যাট্রিস লুমুম্বা নামেই পরিচিত ছিল। ২০২৩ সালের ২৩ মার্চ রুশ সরকার ভার্সিটিকে পুরানো নাম ফিরিয়ে দেয়। বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমানে প্যাত্রিস লুমুম্বা রাশিয়ান পিপলস ফ্রেন্ডশিপ ইউনিভার্সিটি (পিএফইউআর) নামে পরিচিত।
গত শতাব্দীর পঞ্চশ ও ষাটের দশকে একের পর এক দেশ উপনিবেশের শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীন হতে শুরু করে আর এই প্রক্রিয়ায় সাহায্য করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিজয়ী সোভিয়েত ইউনিয়ন। নব্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত দেশগুলো গঠনের জন্য প্রয়োজন ছিল শিক্ষিত ও দক্ষ বিশেষজ্ঞের। এই সমস্যা সমাধানের জন্য একটি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় গঠন করা হয় যার প্রধান কাজ ছিল এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোর জন্য উচ্চ শিক্ষিত বিশেষজ্ঞ তৈরি করা যারা বিভিন্ন জাতির মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্বের চেতনা নিয়ে বেড়ে উঠবে, আন্তর্জাতিকতাবাদে উদ্বুদ্ধ হবে। এছাড়া এই বিশ্ববিদ্যালয় সোভিয়েত তরুণ সমাজকেও উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করবে। সে সময় বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের মধ্য দিয়ে বিদেশ থেকে ছাত্রদের এখানে আনা হত। অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশের সরকারও এতে অংশ গ্রহণ করত। আর সেটা নির্ভর করত এসব দেশের সাথে সোভিয়েত ইউনিয়নের সম্পর্কের উপর। সোভিয়েত ইউনিয়ন তৃতীয় বিশ্বের সব দেশের জন্যই এক্ষেত্রে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিত, কিন্তু অনেক দেশ রাজনৈতিক কারণে এই ডাকে সাড়া দিত না। তবে সোভিয়েত ইউনিয়ন বিভিন্ন দেশের কমিউনিস্ট পার্টি, মৈত্রী সমিতি, ট্রেড ইউনিয়ন, প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন ও রাজনৈতিক দলের মাধ্যমে ছাত্র সংগ্রহ করত।
১৯৬০ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রম শুরু হয়। যেহেতু শিক্ষার মাধ্যম ছিল রুশ তাই সে বছর শুধু প্রস্তুতি পর্ব কাজ শুরু করে। এখানেই বিদেশী ছাত্রছাত্রীরা এক বছর রুশ ভাষা শেখে। এটা আজও বিদ্যমান আছে। ১৯৬১ সাল থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং, হিস্ট্রি অ্যান্ড ফিলোলজি, মেডিসিন, এগ্রিকালচার, ফিজিক্স-ম্যাথেমাটিক্স অ্যান্ড ন্যাচারাল সাইন্স, ইকোনমি অ্যান্ড ল ফ্যাকাল্টি কাজ শুরু করে। ১৯৬৪ সালে গণ মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয় ইন্টারন্যাশনাল এসোসিয়েশন অব ইউনিভার্সিটিজের সদস্যপদ লাভ করে এবং বিশ্ব যুব উৎসবে প্রতিনিধি পাঠানোর অধিকার পায়। ১৯৬৫ সালে ইউনিভার্সিটি থেকে প্রথম বারের মত ৪৭ দেশের ২২৮ জন গ্র্যাজুয়েট বের হয়। ১৯৭৫ সালে এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার জন্য বিশেষজ্ঞ তৈরিতে বিশেষ অবদান রাখার স্বীকৃতি স্বরূপ গণ মৈত্রী অর্ডারে ভূষিত করা হয়। সোভিয়েত আমলে ইউনিভার্সিটির পৃষ্ঠপোষক ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের ট্রেড ইউনিয়ন, এশিয়া ও আফ্রিকার দেশ সমুহের সাথে সোভিয়েত সংহতি কমিটি, বিভিন্ন দেশের সাথে সোভিয়েত ইউনিয়নের মৈত্রী সমিতি। ১৯৯২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ইউনিভার্সিটির নাম পরিবর্তন করে রাশিয়ান গণ মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয় রাখা হয় আর ইউনিভার্সিটির পৃষ্ঠপোষকের ভূমিকা গ্রহণ করে রুশ মন্ত্রী সভা। ১৯৯০ এর দশকে এখানে বেশ কিছু নতুন ফ্যাকাল্টি প্রতিষ্ঠিত হয় – ইকোলজি, ইকোনমি, জুডিশিয়াল, হিউম্যানিটারিয়ান অ্যান্ড স্যোশাল সাইন্স। এ ছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যেই কিছু নতুন ইনস্টিটিউট খোলা হয় – ফরেন লাঙ্গুয়েজ, ওয়ার্ল্ড ইকোনমি অ্যান্ড বিজনেস, ডিস্টান্ট এডুকেশন, রেস্টুরেন্ট বিজনেস অ্যান্ড ট্যুরিজম, গ্র্যাভিটেশন অ্যান্ড কসমোলজি। এই সময় থেকে গণ মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয় আগের মত সরাসরি মাস্টার্সের পরিবর্তে ব্যাচেলর ও মাস্টার্স ডিগ্রি প্রদান করতে শুরু করে। উল্লেখ করা যেতে পারে যে মস্কো স্টেট ইউনিভার্সিটি সহ অনেক ইনস্টিটিউট এখনও সরাসরি মাস্টার্স ডিগ্রি প্রদান করে। ২০০৭ সাল থেকে গণ মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা ইউরোপিয়ান ডিপ্লোমা পেতে পারে। ২০০৯ সাল থেকে গণ মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয় সিআইএস দেশগুলোর সমস্ত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমূহের মুখপাত্র হিসেবে কাজ করছে। ২০১৫ সালে গণ মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয় ব্রিকস দেশগুলোর সবচেয়ে নামী ইউনিভার্সিটিগুলোর সংগঠন ব্রিকসের ইউনিভার্সিটি লীগে প্রবেশ করেছে। এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকা, আমেরিকার ২৫০ এর অধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে গণ মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয় দ্বিপাক্ষিক চুক্তিতে আবদ্ধ যার মধ্য দিয়ে এই ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা কয়েক মাসের জন্য অন্য কোথাও পড়াশুনা করতে পারে, স্বল্পমেয়াদী ভিজিটে যেতে পারে, দুই প্রতিষ্ঠান থেকে সনদপত্র পেতে পারে ও আন্তর্জাতিক কনফারেন্সের আয়োজন করতে পারে। ২০১৭ সালে গণ মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এক লক্ষ তম গ্র্যাজুয়েট হিসেবে নেপালের বাত্তরি হরি ডিপ্লোমা পায়। বর্তমানে গণ মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৬০ দেশের ৫০০ জাতির ছাত্রছাত্রীরা পড়াশুনা করে।
আমাদের ছাত্রজীবনে বর্তমানের মত রেটিং ছিল না। অবশ্যই সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চেষ্টা করত যতদূর সম্ভব ভালো শিক্ষা দিতে, কিন্তু রেটিং-এর পেছনে এখন যেভাবে সবাই ছুটে তখন মনে হয় তেমন ছিল না। এটাও মনে হয় শিক্ষার বাণিজ্যিক রূপ। শুধু ভার্সিটি কেন এমনকি কোন পেপার সাবমিট করার আগে সবাই দেখে ঐ জার্নালের রেটিং কেমন। এই সুযোগে অনেক কমার্শিয়াল জার্নাল জন্ম নিচ্ছে যেখানে পেপার পাবলিশ করতে হলে পে করতে হয়। তবে এসব জার্নালের অনেকেরই রেটিং বেশ ভালো। একই সাথে অনেক পাবলিশিং হাউজ নতুন জার্নাল বের করে এবং সেই সব হাউজের প্রতিষ্ঠিত জার্নালে পেপার সাবমিট করলে তারা বিভিন্ন অজুহাতে চেষ্টা করে সেসব পেপার যেন তাদের কমার্শিয়াল জার্নালে পাঠানো হয়। যদিও রেটিং সিস্টেম শিক্ষক ও গবেষকদের কাজে ব্যস্ত রাখে তবে অনেক ক্ষেত্রে সময় নিয়ে ধীরে সুস্থে কাজ করার পরিবর্তে গবেষকরা বেশি বেশি পেপার পাবলিশ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এটা আমাকে প্রায়ই সোভিয়েত আমলে বিভিন্ন কল কারখানায় প্ল্যানের চেয়ে বেশি উৎপাদন করে রাষ্ট্রীয় পুরস্কার পাওয়ার কথা মনে করিয়ে দেয়। গণ মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ও এই রেটিং এড়িয়ে যেতে পারে না। ২০১০ সালে উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য বিশেষজ্ঞ তৈরিতে অবদানের জন্য গণ মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয় ইউনেস্কোর গোল্ড মেডেল পায়। ২০১১ সালে আন্তর্জাতিক কর্মকাণ্ডে পিএফইউআর রাশিয়ায় প্রথম স্থান অধিকার করে। ২০১২ সালে আমাদের ভার্সিটি নিজেরাই নিজেদের শিক্ষা মাণ নির্ধারণের অধিকার পায়। ২০১৪ সালে পিএফইউয়ার সি ক্যাটাগরি ভুক্ত যায় যা এখানে উঁচু মানের শিক্ষার স্বীকৃতি। ২০১৪/২০১৫ শিক্ষা বছরে পিএফইউয়ার রাশিয়ার উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রথম পাঁচের মধ্যে প্রবেশ করে। ২০১৬ সালে শিক্ষা মাণ, আন্তর্জাতিকতা, ইনফ্রাস্ট্রাকচার, ইন্নোভেশন ও স্যোশাল এনভাইরনমেন্ট এই পাঁচ ক্যাটাগরিতে কিউএস স্টার নামক আন্তর্জাতিক সংস্থার ফাইভ স্টার পায়। ২০২০ সালে সর্বমোট আটটির মধ্যে ছয়টি ক্যাটাগরিতে পিএফইউয়ার ফাইভ স্টার অর্জন করে। ২০২১ সালে গণ মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয় বিদেশী ছাত্র সংখ্যার দিক থেকে রাশিয়ায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে। ২০২২ সালে গণ মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয় সবচেয়ে সবুজ ভার্সিটি হিসেবে স্বীকৃতি পায় যা পরিবেশের প্রতি কর্তৃপক্ষের বিশেষ নজরের কথা বলে। ২০২২ সালে ইউনিভার্সিটির তিনটি মিশন নামে আন্তর্জাতিক রেটিং-এ গণ মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয় ২৮৫ তম স্থান দখল করে, রাশিয়ার ১০০ সেরা উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান লিস্টে ১৯ তম ও প্রভাবশালী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রেটিং-এ ৮ তম স্থান দখল করে। ২০২৩ সালে রাশিয়ার উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের রেটিং-এ পিএফইউয়ার চতুর্থ। এছাড়াও বর্তমানে রসায়নে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বের ২৩ তম ও গণিতে ৭৩ তম স্থান দখল করে। এছাড়াও ভাষাতত্ত্ব ও মেডিসিনে প্রথম একশোর মধ্যে পড়ে। সেদিক থেকে দেখলে আগে যদি গণ মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়কে বহির্বিশ্বে বিপ্লবী তৈরির কারখানা হিসেবে দেখা হত বর্তমানে সে শিক্ষার ক্ষেত্রেও বিশ্বের স্বীকৃতি পাচ্ছে।
বর্তমানে গণ মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন ফ্যাকাল্টি ও ইনস্টিটিউট কাজ করে – এগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলোজি, ইনস্টিটিউট অফ বাইয়োকেমিক্যাল টেকনোলোজি অ্যান্ড ন্যানোটেকনোলোজি, মেডিক্যাল ইনস্টিটিউট, ইঞ্জিনিয়ারিং একাডেমী, ফ্যাকাল্টি অফ ফিজিক্স, ম্যাথেমাটিক্স অ্যান্ড ন্যাচারাল সাইন্স, ফ্যাকাল্টি অফ আর্টিফিশিয়াল ইনটিলেক্ট, ফ্যাকাল্টি অফ হিউম্যানিটারিয়ান অ্যান্ড স্যোশাল সাইন্সেস, ফিলোলজিক্যাল ফ্যাকাল্টি, ফ্যাকাল্টি অফ রাশান লাঙ্গুয়েজ, ইকোনোমিক ফ্যাকাল্টি, জুডিশিয়াল ইনস্টিটিউট, হাইয়ার স্কুল অফ ম্যানেজমেন্ট, ইনস্টিটিউট অফ ফরেন ল্যাঙ্গুয়েজেস, ইনস্টিটিউট অফ গ্র্যাভিটেশন অ্যান্ড কসমোলজি, ইনস্টিটিউট ওয়ার্ল্ড ইকোনমি অ্যান্ড বিজনেস, ইনস্টিটিউট অফ এক্সটারনাল ইকোনমিক্যাল সেফটি অ্যান্ড কাস্টমস, ইনস্টিটিউট অফ মেডিকো-বাইয়োলজিক্যাল প্রবলেমস, ইনস্টিটিউট রাশিয়ান ল্যাঙ্গুয়েজ, ইনস্টিটিউট অফ ফার্মেসি অ্যান্ড বাইওটেকনোলজি, ইনস্টিটিউট অফ ওরিয়েন্টাল মেডিসিন, ইনস্টিটিউট অফ একোলজি, ইনস্টিটিউট অফ মডার্ন ল্যাঙ্গুয়েজেস, ইন্ট্রা-কালচারাল কম্যুনিকেশন অ্যান্ড মাইগ্রেশন, ইনস্টিটিউট অফ ব্রেইন। মস্কো ছাড়াও বর্তমানে সচি শহরে গণ মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা রয়েছে।
উপরের লেখা থেকে বোঝাই যায় গণ মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয় এখন আর আগের মত এক্সটিক কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, বরং রাশিয়া ও বিশ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয় যা শিক্ষার পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের ও জাতির তরুণতরুণীদের মধ্যে সৌহার্দ্য গড়ে তুলতে বিরাট ভূমিকা রাখে। আমি নিজে ১৯৮৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বর থেকে ১৯৯৩ সালের ২৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত ছাত্র ও পিএইচডি গবেষক হিসেবে এখানে ছিলাম। ২০০১ সালে অল্প কিছুদিনের জন্য এখানে শিক্ষকতা করলেও ২০১৭ সাল থেকে আজ পর্যন্ত নিয়মিত শিক্ষকতা করছি। তাই নিজের অভিজ্ঞতা থেকেও এ সম্পর্কে কিছু বলার আছে। আমাদের সময় ইউনিভার্সিটি ছিল বিশের কোঠার তরুণ। তখন এখানে যারা পড়াশুনা করত তাদের বেশির ভাগ সমাজতান্ত্রিক আদর্শে বিশ্বাস করত, দেশে ফিরে দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখত। মন হয় তখন আমাদের স্বপ্নগুলো ছিল অন্য রকমের। একই সাথে আজকের মত প্রযুক্তিগত সুযোগ ছিল না সে সময়। তবে ছিল শিক্ষকদের অকৃত্রিম ভালোবাসা, সাহায্যের হাত। প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে ভার্সিটি বদলিয়েছে, যোগ হয়েছে নতুন নতুন বিষয়। বেড়েছে ছাত্র সংখ্যা। আমাদের সময় প্রায় ৭৫% ছিল বিদেশী, এখন বিদেশীদের সংখ্যা শতকরা হারে অনেক কম। সারা বিশ্বের মত গণ মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ও আজ ছুটছে রেটিং-এর পেছনে। এটা আমাকে অনেকটা জিপিও-৫ এর কথা মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু জিপিও-৫ কি সব সময় প্রকৃত শিক্ষা বা জ্ঞানের সূচক? তবে এটা আমার ব্যক্তিগত মতামত। কারণ সোভিয়েত আমলে ফিজিক্সে ভর্তি হত সোভিয়েত ইউনিয়নের সেরা ছেলেমেয়েরা। এখন তারা যায় ইকনোমিক্স, ফাইন্যান্স, ল এসব বিষয়ে আর ফিজিক্সে আসে যারা এসব জায়গায় চান্স পায় না তারা। আর ভালো যারা আসে তারা ব্যাচেলর ডিগ্রি পেয়ে অন্য কোথাও চলে যায়। হয়তো এ কারণেই আমি এতটা ক্রিটিক্যাল। তাছাড়া সোভিয়েত আমলে অনেক ভালো ভালো টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট বিদেশীদের জন্য তো বটেই এমনকি সব সোভিয়েত নাগরিকদের জন্য খোলা ছিল না যুদ্ধাস্ত্র তৈরির সাথে জড়িত ছিল বলে। এখন ঐসব প্রতিষ্ঠানের দুয়ার খুলে দেয়ায় তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যায় আমাদের ইউনিভার্সিটিতে ছাত্র সংখ্যা কমে গেছে। তবে একটা জিনিস জোর দিয়ে বলা যায় এখনকার শিক্ষকগন আগের মতই বন্ধুসুলভ, হেল্পফুল। ব্যুরোক্রাসি অনেকটা বাড়লেও পড়াশুনার মাণও বেড়েছে। অনবরত চেষ্টা চলছে শিক্ষক ও ছাত্রদের আধুনিক প্রযুক্তির সাথে পরিচয় করিয়ে দেবার। আমাকে এখানে পড়াশুনা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে আমি বরাবরই বলি – শিক্ষার সুযোগ প্রচুর, তবে কন্ট্রোল তেমন নেই (ফর্মাল কন্ট্রোল অনেক বেশি, তবে আমাদের সময় যেভাবে মৌখিক পরীক্ষা হত এখন খুব কম শিক্ষকই সেভাবে পরীক্ষা নেন) তাই সবকিছু নির্ভর করে ছাত্রের নিজের উপর। যদি কেউ চায় ও পরিশ্রম করে তাহলে বিশ্বের সেরা বিশেষজ্ঞ হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে পারে।
যদিও পিএফইউআর আগের সেই রাজনৈতিক গ্ল্যামার হারিয়েছে তারপরেও সে রাজনীতির বাইরে নয়। প্রথম দিন থেকেই এটা ছিল বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন জাতির সাংস্কৃতিক বিনিময়ের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। প্রায় প্রতি সপ্তাহেই ছিল কোন না কোন দেশের জাতীয় দিবস। সেই উপলক্ষ্যে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এছাড়া আন্তর্জাতিক দিবসগুলো তো ছিলই। বিশেষ করে ১৯৮৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে গণ মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে ও সেই বছর গ্রীষ্মে বিশ্ব যুব উৎসব উপলক্ষ্যে বিভিন্ন দেশের ছেলেমেয়ে মিলে আমরা সাংস্কৃতিক টিম তৈরি করি। চিলি, কলোম্বিয়া, সাউথ আফ্রিকা, সিরিয়া, জর্ডান, ভারত, বাংলাদেশের ছেলেমেয়েদের গান, পেরু, নাইজেরিয়া, সাইপ্রাসের ছেলেমেয়েদের নাচ – সে এক ভিন্ন জগত। সবচেয়ে বর কথা এটা দর্শক হিসেবে দেখা নয়, ভেতরে থেকে দেখা। এভাবেই আমরা একে অন্যের সান্নিধ্যে আসতাম, একে অন্যকে বোঝার চেষ্টা করতাম। এছাড়া ছিল মাঝে মধ্যে একসাথে খাওয়া দাওয়া করা, একসাথে রান্না করা, এক সাথে হোম টাস্ক করা। নির্মাণ দলে গিয়ে বিভিন্ন দেশের লোকজনদের সাথে ঘনিষ্ঠ ভাবে মেশা। বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষ তারপরেও প্রায় কোন রকম সমস্যা ছাড়াই দিন কাটানো। এখন কেউ সেই সময়ের কথা মনে করলে বড়জোর খাবার চুরির কথা মনে করে হাসে। মানে অনেক সময় কেউ কেউ রান্নাঘর থেকে খাবার নিয়ে চলে যেত। খাওয়া শেষে হাঁড়িপাতিল ঠিকই ফেরত দিত। প্রায় ৩০ বছর পর এবার যখন অনেকের সাথে দেখা হল, টেলিফোন বিনিময় করলাম, কেউ কেউ পাঠাল ১৯৮৬ সালে সাইবেরিয়ায় কাজ করার ছবি। সবাই এক বাক্যে বলল, যদি এমন সুযোগ আসত, আবার সেখানে যেতাম কয়েকদিনের জন্য। এখন সবাই জীবনে প্রতিষ্ঠিত, তারপরেও সেই সময়ে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছে। মানে সেই দিনগুলোয় সত্যিকার অর্থেই এমন কিছু ছিল যার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে আমরা সবাই আজও কৃতজ্ঞ। আর এ কারণেই আমাদের স্লোগান – এক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশ্ব আবিষ্কার কর! এবার অনুষ্ঠানের শেষ বক্তা হিসেবে দীর্ঘ দিনের রেক্টর বর্তমানে প্যাট্রিস লুমুম্বা গণ মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির ফিলিপভ তাই বলেছেন – এতদিন আমরা শত শত জাতির মানুষ এক বিশ্ববিদ্যালয়ে শান্তিপূর্ণ ভাবে সহাবস্থান করতে শিখেছি ও সেটা করেছি খুব সফল ভাবেই। এখন আমাদের এই অভিজ্ঞতা সমাজে নিয়ে যেতে হবে, বহির্বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে হবে। জাতিতে জাতিতে মানুষে মানুষে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করে এক শান্তিপূর্ণ পৃথিবী গড়ে তুলতে হবে। এই হোক আমাদের আগামী দিনের স্লোগান।
গবেষক, জয়েন্ট ইনস্টিটিউট ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চ
শিক্ষক, রাশিয়ান পিপলস ফ্রেন্ডশিপ ইউনিভার্সিটি, মস্কো