বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক নতুন বাংলাদেশ পেতে হলে গণ মানুষের স্বার্থরক্ষাকারী শক্তি গড়ে তুলতে হবে- অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ
গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে ছাত্র, শিক্ষক, শ্রমিকসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের সমন্বয়ে গড়ে উঠা সংগঠন ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতা অধিকার রক্ষা পরিষদ’ এর উদ্যোগে আজ ৩১ অক্টোবর,বিকাল ৩টায় ষোলশহর রেলওয়ে স্টেশন চত্বরে ‘জুলাই অভ্যূত্থান’শীর্ষক সমাবেশ,গণঅভ্যুত্থানের আলোক চিত্র প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়।বৈষম্যবিরোধী ছাত্র জনতা অধিকার রক্ষা পরিষদ এর আহবায়ক আসমা আক্তার ও করেন ওমর সমুদ্রের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মাহা মির্জা, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতা অধিকার রক্ষা পরিষদের উপদেষ্টা ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জি এইচ হাবীব,বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতা অধিকার রক্ষা পরিষদের উপদেষ্টা প্রফেসর তহুরিন সবুর, কবি ও সাংবাদিক আহমেদ মুনির, আন্দোলনে আহত চবি শিক্ষার্থী শুভ, শ্রমজীবী মানুষের প্রতিনিধি নূপূর বেগম প্রমূখ। লিখিত বক্তব্য পাঠিয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র – জনতা অধিকার রক্ষা পরিষদের উপদেষ্টা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আধ্যাপক হাবীব জাকারিয়া উল্লাস। অনুষ্ঠানের মুরুতে গণঅভ্যূত্থানে শহীদ স্মরণে শহীদ বেদীতে পুষ্পস্তবক অর্পন করেন অতিথিবৃন্দ ও সমবেত কন্ঠে গান গেয়ে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন।
সমাবেশে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন,“গত ১৫ বছরে উন্নয়নের নামে এস আলম,বসুন্ধরাসহ কিছু ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর অবিশ্বাস্য লুটপাট, ব্যাংক লুট, বিদেশে অর্থ পাচার,বিনাভোটে নির্বাচন, দমন পীড়ন, হাট-ঘাট- নদী-পাহাড় দখল,বিচারবহির্ভূত হত্যা- গুম,সন্ত্রাস,সমস্ত সেক্টরে দূর্নীতি,চাঁদাবাজি দেখেছি।এর বিরুদ্ধে ছাত্রদের আন্দোলনে শ্রমজীবি মানুষ ও জনগণের পুঞ্জিভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটেছে গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে।
গণঅভ্যুত্থানের পর আবার সে অবস্থার পুনরাবৃত্তি মানুষ চায়না। ফলে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা অনেক।সরকার তিন মাসে অনেক সমস্যার সমাধান করবে, এটা আমরা কেউ মনে করিনা। কিন্তু শুরুতে সরকারের যে কাজ করা দরকার, তা করছেন কিনা, তা দেখে বলতে পারি, সরকার ঠিক পথে এগুচ্ছে কিনা? আন্দোলনে নিহত ও আহতদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরির কাজ ছিল সরকারের প্রথম কাজ, কিন্তু তিনমাস হয়ে গেলেও সরকার এখনও তালিকা তৈরি করতে পারেনি। এখানে উপস্থিত আন্দোলনে গুলিতে চোখ হারানো একজন ছাত্র আছেন, তিনি বললেন, তাকে কেন তালিকায় নাম উঠানোর জন্য সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরতে হবে? কেন তালিকা তৈরিতে এত অবহেলা,শৈথিল্য? দ্বিতীয় কাজটা ছিল, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা, নিরাপত্তা দেওয়া- তারও কোন উন্নতি দেখা যাচ্ছেনা। তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে আওয়ামীলীগ ও ছাত্রলীগের ভাষায় কথা বলা বন্ধ করার আহবান জানান। তিনি আরো বলেন,“যেই লঙ্কায় যায়,সেই রাবণ হয়- মানুষের মধ্যে এ ধরণের হতাশা কাজ করছে। কিন্তু কেন পরিবর্তন হয়না- তার কারণটা আমাদের বুঝতে হবে। কারণ সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষ তাদের স্বার্থে যদি ঐক্যবদ্ধ না হয়, তাদের স্বার্থ রক্ষা করার জন্য সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তি গড়ে না উঠে, তাহলে লঙ্কায় যে যাবে, সে রাবণই হবে, সত্যিকার পরিবর্তন হবেনা। এজন্য আজ প্রয়োজন সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষের সংগঠিত শক্তি ও অবস্থান গড়ে তোলা।” শিক্ষক ও গবেষক মাহা মির্জা বলেন, “গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার সাথে বড় অংশের শ্রমজীবি মানুষ রাস্তায় নেমেছিলেন। কিন্তু হতাশার সাথে বলতে হচ্ছে, যে নতুন বাংলাদেশ পেলাম, তা কতটুকু নতুন। অতীতে বিভিন্ন সরকার পরিবর্তনের পর শ্রমজীবি মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন হয়নি।মূল্যবৃদ্ধির কারণে শ্রমজীবি মানুষ ক্রমাগত তাদের খাবার তালিকা থেকে মাছ,মাংস, ডিম বাদ দিতে বাধ্য হয়েছে। আওয়ামীলীগের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভের বড় কারণ ছিল সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম।অথচ এখনও সিন্ডিকেটের কারণে দ্রব্যমূল্য লাগামছাড়া। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কি চাইলে রাষ্ট্রীয় শক্তি ব্যবহার করে তিনমাসে সিন্ডিকেট উচ্ছেদ করতে পারতোনা? অন্তবর্তীকালীন সরকার খুব দূর্বলতার পরিচয় দিচ্ছেন।’ তিনি আরো বলেন,“গার্মেন্টস শ্রমিক যখন বকেয়া বেতনের দাবিতে রাস্তায় নামছে,তখন আওয়ামীলীগের মতো একই কাযদায় গুলি করে দমন করা হচ্ছে।অতীতের মতই একে বহিরাগতদের ষড়যন্ত্র বলে চিহ্নিত করা হচ্ছে। শ্রমিকের সাথে আলোচনা করুন,তাঁর ব্যথার কথা শুনুন, কেন তাঁর উপর গুলি চালাবেন? শ্রমিকের উপর যেন আর একটা গুলি না চলে, এটাই আমরা চাই।শ্রমজীবিদের দুঃসহ অবস্থা পরিবর্তনের জন্যও সরকারের কোন উদ্যোগ চোখে পড়ছেনা।শ্রমজীবি মানুষ যদি দুধ, ডিম কিনে খেতে না পারে,তাহলে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ, নতুন বাংলাদেশ – এ কথাগুলো কোনো অর্থবহ হয়না। সত্যিকারের নতুন বাংলাদেশ করতে হলে বিগত সময়ে সৃষ্টি অন্যায় ও অশ্লীল অর্থনৈতিক বৈষম্য কমাতে হবে, শ্রমজীবিদের মানসম্মত জীবন নিশ্চিত করতে হবে,সিন্ডিকেট ভেঙ্গে মূল্যবৃদ্ধি নিযন্ত্রণ করতে হবে। ” শিক্ষক ও অনুবাদক জি এইচ হাবীব বলেন,স্বাধীনতার ৫২ বছর এমন কোন সময় আসেনি,যখন বৈষম্য,দারিদ্র,মূল্যবৃদ্ধি,লুটপাট,গণতন্ত্রহীনতা,সবলের দাপট ছিলনা।গত ১৫ বছরে তা চরম রূপ ধারণ করে এক শ্বাসরোধী পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। যার বিরুদ্ধে ছাত্র- জনতা- শ্রমজীবি মানুষ মিলে গণঅভ্যুত্থানে শরীক হয়েছিলো।অথচ শ্রমজীবি মানুষ আজ উপেক্ষিত।” কবি ও সাংবাদিক আহমেদ মুনির বলেন,“ফ্যাসিবাদী শাসকের পতন হলেও,ফ্যাসিবাদী মননকাঠামো,প্রবণতা বিদায় হয়নি।ভিন্নমতের উপর হামলা,বিভিন্ন জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর আক্রমণে সেই একই ফ্যাসিবাদী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।ফ্যাসিবাদকে পরাস্ত করতে হলে চায় ভিন্নমত-সম্প্রদায়ের প্রতি শ্রদ্ধা, গণতান্ত্রিক চর্চা,পরমতসহিষুতা,ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে জনগণের ঐক্য।” সাবেক অধ্যক্ষ তহুরিন সবুর গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের পরিবার ও আহতদের রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের দাবি জানান। আন্দোলনে আহত হয়ে চোখ হারানো শিক্ষার্থী শুভ বলেন,“আন্দোলনে আমি চোখ হারিয়েছি,কিন্তু আমার কোন দুঃখ নেই,কারণ আমি ফ্যাসিবাদী শাসকের বিরুদ্ধে ছাত্র- জনতার ন্যায়সঙ্গত লড়াইয়ে অংশ নিয়েছি।প্রয়োজন হলে আবার লড়াইয়ে নামবো।”তিনি আহত হওয়ার পর চিকিৎসার ব্যয় নির্বাহে আর্থিক সহযোগিতার জন্য সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে দপ্তরে আবেদন নিয়ে ছুটে বেড়ানোর অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন। সভাপতি আসমা আক্তার তার বক্তব্যে বলেন, একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক দেশ ও সমাজ গড়ে তোলার লক্ষ্যে জনগণের বিভিন্ন অংশকে সংগঠিত করে কাজ করার আকাঙ্ক্ষা এই সংগঠনের। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ১৬ বছরের ফ্যাসিস্ট সরকারকে উৎখাত করে দেশের জনগণ বিজয় পেয়েছে। সে বিজয়কে রক্ষা করতে ছাত্রজনতা বদ্ধপরিকর। সারাদেশের আনাচে-কানাচে অধিকারবঞ্চিত ছাত্র-জনতা নিজেদের অধিকার নিশ্চিত করতে দেশ পুনর্গঠনের কাজে সোচ্চার হয়ে উঠেছে। জনতার এই দাবি বাস্তবায়ন করার লড়াইয়ে সকলকে এগিয়ে আসার আহবান করেন। তিনি আরো বলেন, জনতার গণদাবী সমূহ সরকার দ্রুততার বাস্তবায়ন করে জুলাই অভ্যুত্থানের মূল স্পিরিটকে সামনে রেখে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে অন্তর্বতীকালিন সরকার যথাযথ উদ্যোগ নেবেন। সমাবেশ থেকে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার, শহিদদের পরিবারকে আর্থিক সহযোগিতা এবং আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নেওযা, সরকারি খাস জমি উদ্ধার করে ভূমিহীনদের আবাসনের জন্য যথাযথ ব্যাবস্থা গ্রহণ করে পূর্নবাসন,নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম কমানো, গার্মেন্টস শ্রমিকদের নূন্যতম মজুরি ২৫ হাজার টাকাসহ ১০ দফা দাবী বাস্তবায়ন করার জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে দাবি জানানো হয়। সংবাদ প্রেরক জ্যোতি বড়ুয়া সদস্য সচিব বৈষম্যবিরোধী ছাত্র- জনতা অধিকার রক্ষা পরিষদ,চট্টগ্রাম। গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্খিত বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক নতুন বাংলাদেশ পেতে হলে সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষের স্বার্থরক্ষাকারী সংগঠিত শক্তি গড়ে তুলতে হবে- ষোলশহরে সমাবরশে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ